• শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:১৬ অপরাহ্ন

দূর্নীতির টাকায় সওজ প্রকৌশলী এমদাদুল হকের সম্পদের পাহাড়

/ ৯৭ বার পঠিত
আপডেট: শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৩

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঘুষের টাকায় কেনা গাড়ি নিজের মেয়েকে উপহার হিসেবে দিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ঢাকা সাব ডিভিশন-২ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. এমদাদুল হক (গাড়ি নং-মেট্রো-চ-২০-৪৫৪১)। সওজের আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এমদাদুল হক ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির দায় স্বহস্তে লিখিত আবেদনের মাধ্যমে ট্রুথ কমিশনের কাছে স্বীকার করে অনুকম্পা (মার্জনা) নিলেও পরবর্তীতে ট্রুথ কমিশনের সকল কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ফলে সেই অনুকম্পাও অবৈধ ছিল। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হলেও অবৈধ অর্থের জোরে সাবেক সচিব ও বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে ২০১৭ সালে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

এক সময়ের ছাত্রদল নেতা প্রকৌশলী এমদাদুল হক বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আগের মতোই ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িতে পড়েন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক তার চাকরি জীবনের শুরু থেকে বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে তিনি ও তার পরিবার বিলাসী জীবনযাপন করছেন। অবৈধ অর্থে নামে-বেনামে গড়েছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। থাকেন দেড় কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, চড়েন অর্ধকোটি টাকা মূল্যের গাড়িতে।

তার বড় মেয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে সিএসই’তে অধ্যয়নরত। যেখানে পড়াতে প্রতিমাসে লক্ষ লক্ষ টাকা বেতন গুনতে হয়। সামান্য বেতনের একজন কর্মচারি হয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানদের পড়ালেখা করানোসহ বিলাসী জীবনযাপনের অর্থ আয়ের পন্থা যে অবৈধ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সরেজমিন অনুসন্ধানেও দুর্নীতিবাজ এ প্রকৌশলীর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে। প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক রাজধানী ঢাকার গ্রীন রোডে ১৪ গ্রীন স্কয়ার ‘উদয় গ্রীন’-এ ১৬৩০ বর্গফুটের যে ফ্ল্যাটে (ফ্ল্যাট নং: ডি-৩) থাকেন তার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। বাসার পার্কিংয়ে রয়েছে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি। টয়োটা হাইব্রিড ব্র্যান্ডের ঐ গাড়ির নম্বর: ঢাকা মেট্রো-চ-২০-৪৫৪১। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৯ জুন ২০২২ ইং তারিখে ঐ গাড়িটি মো. এমদাদুল হক-এর নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। বাড়ির কেয়ারটেকার নজরুল জানান, ঐ গাড়িটি মো. এমদাদুল হকের মেয়ে বেশিরভাগ সময় ব্যবহার করেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এমদাদুল হকের গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে তার রয়েছে বিপুল সম্পদের পাহাড় এবং বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে নামে-বেনামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক-ব্যালেন্স। দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। যা রীতিমত পিলে চমকে উঠার মতো।


জানা গেছে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত ট্রুথ কমিশন-এ স্বশরীরে গিয়ে নিজের দুর্নীতির কথা স্বীকার করে অনুকম্পা বা মার্জনা নিয়েছিলেন প্রকৌশলী এমদাদুল হক। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নরসিংদী সড়ক উপ-বিভাগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে ট্রুথ কমিশনে হাজির হয়ে স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে স্বহস্তে লিখিত আবেদনে স্বাক্ষর করে শপথপূর্বক দুর্নীতি করার স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। ট্রুথ কমিশনের মামলা নম্বর সজক/আইন/২০০৮/দুদক/৩৬৫ এর দলিল দস্তাবেজ হতেও সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, মো. এমদাদুল হক দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ আয় করেছেন। অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের দায় লিখিতভাবে স্বীকার করে গত ২২-১২-২০০৮ ইং তারিখে ট্রেজারী চালান নং-০৮/৮ এর মাধ্যমে ২ লক্ষ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান করেন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এমদাদুল হক।

পরবর্তীতে সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর বিধিমালা ২(এফ) এর সংজ্ঞা ও ৩(বি) এবং ৩(ডি) বিধি মোতাবেক অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে মো. এমদাদুল হক (পরিচিতি নং-১০০০২৮), উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে স্মারক নং ১সিই-৩/২০১২(ঢাকা)/৬৬/তদন্ত তাং ০১-০২-২০১২ এর মাধ্যমে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তৎপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গত ২২-০৪-২০১২ তারিখে আলোচ্য বিভাগীয় মামলার বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে ১৯-০২-২০১২ তারিখে দায়েরকৃত রীট পিটিশন নং-১৭৮৭/২০১২ এর কাগজ সংযুক্ত করতঃ পুনরায় জবাব প্রদানের নিমিত্তে ১৫ জুলাই, ২০১২ পর্যন্ত সময় বর্ধিত করার জন্য আবেদন করেন। অতঃপর গত ০৩-০৬-২০১২ ইং তারিখে তিনি মহামান্য হাইকোর্টের রীট মামলার বিষয়ে একটি Lawyer’s Certificate সহ সময় বর্ধনের আবেদন করেন।

স্মারক নং ১সিই-৩/২০১২(ঢাকা)/৫০১/তদন্ত তাং ২৮-১২-২০১৪ মোতাবেক মো. এমদাদুল হককে বিভাগীয় মামলার জবাব প্রদানের জন্য পুনরায় তাগিদপত্র প্রদান করা হলে তিনি ৩০-১২-২০১৪ তারিখে বিভাগীয় মামলার জবাব দাখিল করেন এবং জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে স্মারক নং ১সিই-৩/২০১২(ঢাকা/২১/তদন্ত তাং ১২-০১-২০১৫ এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনে শুনানিতে অংশগ্রহণ করে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশের প্রেক্ষিতে তিনি গত ২১-০১-২০১৫ তারিখে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন ও লিখিত জবাব পেশ করেন। উক্ত জবাব গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় স্মারক নং ১সিই-৩/২০১২(ঢাকা)/৭৩/তদন্ত তাং ১০-০২-২০১৫ এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় আনীত অভিযোগসমূহের উপর তদন্ত কার্য পরিচালনার জন্য সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর ৭(৩) উপ-বিধি মোতাবেক ঢাকা তেজগাঁও সড়ক ভবনের কন্ট্রাক্ট ইভ্যালুয়েশন বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব এবং ঢাকা জোনের (পাইকপাড়া, মিরপুর) মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন উপ-বিভাগের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সোহেল রানাকে উক্ত বিভাগীয় মামলার সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনা কর্মকর্তা (Conducting Officer) নিয়োগ করা হয়। তৎপ্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা মো. আহসান হাবিব বর্ণিত বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। যার স্মারক নং-৮৭-কঃইঃ তাং-১৮-০৮-২০১৫ ইং।


তবে রহস্যজনক কারণে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক-এর বিরুদ্ধে আনীত সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর বিধিমালা ২(এফ) এর সংজ্ঞা ও ৩(বি) বিধি মোতাবেক অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বিধায় তিনি নির্দোষ মর্মে উল্লেখপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সর্বশেষ গত ১৫ জানুয়ারি ২০১৭ ইং তারিখ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান স্বাক্ষরিত এক দপ্তরাদেশে (স্মারক নং-১সিই-৩/২০১২(ঢাকা/১৪/তদন্ত) মো. এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। একজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী যেখানে স্বশরীরে লিখিতভাবে নিজেকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ঘোষণা দেন, সেখানে কিভাবে পরবর্তীতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হলেন?-এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী এমদাদুল হকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


আরো পড়ুন