• বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:০০ অপরাহ্ন




প্রণোদনার জোয়ারেও শেয়ারবাজারে অনাস্থা

/ ৩৫ বার পঠিত
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০২২
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)

গত দশ বছরে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতায় উপর্যুপরি প্রণোদনা এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়। এরমধ্যে কোনোটি স্বল্প, কোনোটি মধ্য আবার কোনোটি দীর্ঘমেয়াদি। বিভিন্ন কর ছাড়, অবাধে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ এবং তারল্য সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু এসব প্রণোদনার পরও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। সাময়িকভাবে নির্দিষ্ট কিছু চক্র সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়নি বাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোটা দাগে বাজারে দুটি সংকট। চাহিদার দিক থেকে সংকট হলো এই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। সরবরাহের দিক থেকে সংকট হলো ভালো কোম্পানির সংখ্যা কম। ফলে কারসাজি সিন্ডিকেটের জয়জয়কার অবস্থা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আস্থা ফেরাতে সুশাসন জরুরি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আর আস্থার সংকট না কাটলে বাজার ইতিবাচক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। তিনি বলেন, প্রণোদনা দিলে বাজারে সাময়িকভাবে উপকৃত হয়। এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য সুশাসন জরুরি।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজার অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ফলে প্রণোদনার পরিবর্তে এখানে আইন-কানুন সংস্কার জরুরি। না হলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলে। তিনি বলেন, এ অবস্থার উত্তরণে কৃত্রিমভাবে সূচক না বাড়িয়ে বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।

জানা গেছে, শেয়ারবাজারে ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এ ধরনের বিও অ্যাকাউন্ট (বেনিফিশারি ওনার) সংখ্যা ১ লাখের কাছাকাছি। আবার একজনের দুই-তিনটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, এমন সংখ্যা বাদ দিলে ৫ লাখ টাকার উপরে প্রকৃত বিনিয়োগকারী ৫০ থেকে ৬০ হাজার। এর মধ্যে ৫-৬টি গ্রুপ মিলে ১০ থেকে ১২ হাজার অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করে। এই মুষ্টিমেয় সংখ্যক বিনিয়োগকারী দীর্ঘদিন বাজার দখল করে রেখেছেন। ফলে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা দেওয়া হয়, তা মুষ্টিমেয় কিছু বিনিয়োগকারীর পকেটে যায়। অর্থাৎ প্রণোদনায় উদ্বৃত্ত হয়ে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী কিংবা কোম্পানি আসছে না।

ফলে প্রণোদনার সুফল নেই শেয়ারবাজারে। গত দশ বছরে এখানে দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্পমেয়াদি মিলিয়ে শতাধিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অবাধে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু বাজার টেকসই করা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নয়, নির্দিষ্ট একটি চক্র এই প্রণোদনার সুবিধা পেয়েছে। আর এ সুবিধার জন্য বিভিন্ন সময়ে চক্রটি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে।

এরা বিনিয়োগকারীদের জিম্মি করে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করছে। আর শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অপরদিকে শত শত কোটি টাকা লুটছে বিশেষ চক্র। বাজারে চাহিদার দিক থেকে সমস্যা হলো এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। আর সরবরাহের দিক থেকে সমস্যা হলো ভালো কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম। তাদের মতে, শেয়ারবাজারের উন্নয়নের জন্য সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতের সংস্কার দরকার।

কারণ একটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসে মূলত দুই কারণে। প্রথমত, কোম্পানির সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির জন্য, দ্বিতীয়ত অন্যদের তুলনায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু যে দেশে ব্যাংক থেকে টাকা নিলে ফেরত না দিয়ে পার পাওয়া যায়, সেখানে শেয়ারবাজারে পুঁজির জন্য কোম্পানিগুলো আসতে আগ্রহী হবে না। অন্যদিকে যেসব কোম্পানিকে কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, বর্তমানে ওই কোম্পানি করই দেয় না। আর কর দিলেও দিলে বিভিন্নভাবে ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে শেয়ারবাজার টেকসই করার জন্য সবার আগে ব্যাংকিং ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার দরকার। এরপর শেয়ারবাজারে নির্মোহভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ক্রয়মূল্যে হিসাব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এটি বাজারমূল্যে হিসাব করা হতো। এক্ষেত্রে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এটি বাজারসংশ্লিষ্টদের দাবি ছিল। ফলে এটি বাস্তবায়ন হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ সীমার বাইরে রাখা হয়েছে।

বাজারের জন্য এটি অনেক বড় প্রণোদনা বলে দাবি করে আসছে সংশ্লিষ্টরা। দশ বছরে ৬ বার কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। এরমধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিনাপ্রশ্নে দেশে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। একজন বিনিয়োগকারী মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়েই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ পায়। এক্ষেত্রে সরকারের অন্য কোনো সংস্থাও টাকার উৎস নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন করবে না বলে ধারায় উল্লেখ করা হয়। আর বাজারে কিছুদিন এর ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও পরে আবার পতন হয়। সুযোগসন্ধানীরা কেটে পড়ে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ আয় করমুক্ত।

প্রণোদনা : বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর ২০১১ সালের ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাজারসংশ্লিষ্টদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাজারের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ৮টি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়। ৮টি প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। এরমধ্যে ছিল ২০১১ সালের বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মার্জিন ঋণের সুদ এক বছরের জন্য স্থগিত, ব্যাংকগুলোর ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) এবং স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রিকোয়ারমেন্ট (এসএলআর) কমানো, কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিওতে কোটা নির্ধারণ অন্যতম।

শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট কাটাতে দুই বছর আগে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সার্কুলারে বলা হয়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুরো রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ দেওয়া হবে। কয়েক ধাপে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে চীনের বিনিয়োগ থেকে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যরা যে অর্থ পেয়েছিল, শেয়ার কেনার শর্তে ওই টাকার ওপর ১০ শতাংশ কর অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ সদস্য আগে থেকেই শেয়ার বিক্রি করে তাদের ডিলার অ্যাকাউন্ট খালি করে রেখেছিল। এরপর চীনের টাকা পেয়ে তারা নতুন করে কিছু শেয়ার কিনেছে। অর্থাৎ টাকা কর অবকাশ সুবিধা নিয়েও তাদের বিনিয়োগ করতে হয়নি। এভাবে বিনিয়োগকারীদের জিম্মি করে বিভিন্ন উপায়ে সুবিধা আদায় করে নিয়েছে একটি চক্র।

বিপর্যয়ের পর ২০১১ সালেও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের ওপর কর দিতে হতো। স্টক এক্সচেঞ্জের দাবির কারণে ধাপে ধাপে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ করমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ডিমিউচুয়ালাইজেশনের পর স্টক এক্সচেঞ্জকে ৫ বছর কর অবকাশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছরে শতভাগ করমুক্ত। এছাড়া কোনো কোম্পানি বা অংশীদারি ফার্ম পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ হতে যে টাকা মুনাফা করে, তার ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর দিতে হতো। এখন তা করমুক্ত। অর্থাৎ কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে মুনাফা করলে উৎসে কর দিতে হয় না। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজসহ সংশ্লিষ্ট ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবের ৫০ শতাংশ সুদ মওকুফ করেছে।

বাকি ৫০ শতাংশ সুদ ব্লক অ্যাকাউন্টে রেখে তিন বছরে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আইপিওতে বিশেষ কোটা দেওয়া হয়েছে। ২০১২ থেকে কোম্পানির আইপিওতে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য ২০ শতাংশ কোটা দেওয়া হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় ৯শ কোটি টাকা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৫ হাজার বিনিয়োগকারী এই সুবিধা পেয়েছে।

এছাড়াও ব্রোকারেজ হাউজের পুনর্মূল্যায়নজনিত ক্ষতির বিপরীতে বিশেষ প্রভিশন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নেতিবাচক ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক হলেও একসঙ্গে প্রভিশনিং করতে হবে না। এছাড়াও ব্যাংক কোম্পানি আইন শিথিল করে ব্যাংকের বিনিয়োগে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজারে এর প্রভাব খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জানা গেছে, একের পর এক অজুহাতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে জিম্মি করে সুবিধা নিচ্ছে বাজার সংশ্লিষ্টরা। একটি প্রণোদনার পর কয়েক দিন সূচক বাড়ে। এরপর টানা পতন শুরু হয়। শুরু হয় নতুন বায়না। এভাবেই গত ১২ বছর চলেছে দেশের শেয়ারবাজার। ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের মেয়াদ ২০ দফায় বাড়ানো হয়েছে।

আগে ব্যাংকগুলো মোট আমানতে ১০ শতাংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারত। কিন্তু ২০১২ সালের পর আইন সংশোধন করে ব্যাংকগুলো তার রেগুলেটরি ক্যাপিটালের ২৫ শতাংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর আগে যারা বেশি বিনিয়োগ করেছিল তা সমন্বয়ের জন্য ২০ দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় এলেই বাজারে পতন। ফলে বিনিয়োগ সমন্বয়ের মেয়াদ বাড়াতে বাধ্য হয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এছাড়াও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর নেতিবাচক অ্যাকাউন্ট সমন্বয়ের মেয়াদও ১০ বারের বেশি বাড়ানো হয়েছে।





আরো পড়ুন