• শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন
171764904_843966756543169_3638091190458102178_n

‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু’  বাঙালি জাতিকে  আরো বড় স্বপ্ন দেখায়

মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা, নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০৯ বার পঠিত
আপডেট: সোমবার, ২০ জুন, ২০২২
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের যুগান্তকারী স্থাপনা পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে । যা ইতোমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে । দেশের সফলতম এই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া অত্যন্ত আনন্দের । যা নিয়ে আমার মত একজন সাধারণ শিক্ষার্থী সত্যিই দেশের সরকারকে নিয়ে গর্বিত এবং কৃতজ্ঞ । এদিকে ‘স্বপ্নের পদ্মা সেতু’ বলতে বলতে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলছি । কিন্তু কী সেই স্বপ্ন? কে দেখলেন সেই স্বপ্ন? কেন তিনি এমন স্বপ্ন দেখলেন? এই স্বপ্ন দেখার কারণটাই বা কী? এসব প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর কি কখনো খুঁজে দেখার চেষ্টা আমরা করি? করি না । লোকে বলে তাই আমরাও বলি- বলতে বলতে আমাদের মুখস্থ হয়ে গেছে! এই মুখস্থ-সর্বস্বতায় আন্তরিকতা নেই বলেই সেই স্বপ্নবাজ মানুষটির স্বপ্ন দেখার অগ্র-পশ্চাৎ পটভূমির কথা আমরা জানি না ।

ভাসা ভাসা জানলেও মনের ভেতর-মহলের অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার সঙ্গে সেই জানাটাকে কোনো অবয়ব দিই না, দিতে চাই না। কিন্তু একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষের তা জানা দরকার, তাকে জানতে হবে। কেননা এর পশ্চাতেও আছে আত্মমর্যাদার অপমান ও গ্লানি থেকে মুক্তিলাভের শাশ্বত প্রয়াস-প্রচেষ্টা । তাই আমাদের ওপরের প্রশ্নগুলোর অন্তত দুয়েকটির সঠিক উত্তর জানার আবশ্যকতা রয়েছে বৈকি। এত বিশাল কর্মযজ্ঞের সাফল্যের পরও সেই মহাযজ্ঞের গল্প, ইতিহাস, পটভূমি না জেনে অজ্ঞ থাকার দিন এখন আর নেই। এখন কোনো বিষয়েই নীরব ও নির্বিকার থাকারও সময় নেই। দেখতে হবে, জানতে হবে, মনের ভেতরকার সুপ্ত প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে যথাযথভাবে। অবশ্য ক্রমানুসারে সব প্রশ্নেরই উত্তর জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই, কিন্তু একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বিশেষ করে ‘এগিয়ে যাওয়া’ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অল্পবিস্তর প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়েই ঘরের বাইরে পা ফেলতে হবে । নইলে পথচলা সম্ভব হবে না, সম্ভব হবে না যথার্থ এগিয়ে যাওয়াও । মনে রাখতে হবে, আমাদের এগিয়ে যাওয়ার বিকল্পই নেই। স্বপ্নের পদ্মা সেতু পার হয়ে আমরা আরো এগিয়ে যাব সামনের দিকে, বড় বড় সব স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিকে। এ সময় স্বপ্নের প্রকৃত পটভূমি না জেনে ভাসাভাসা ধারণা নিয়ে পথ চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে । অসম্ভব এ জন্য যে, অপপ্রচারকারীরা একদা পদ্মা সেতুর কথিত ও বানোয়াট দুর্নীতির গল্প শোনাতে শোনাতে মানুষকে প্রায় অভ্যস্ত করে ফেলেছিল । এখনো আমাদের চারপাশজুড়ে কেবল মিথ্যা অপপ্রচারের ডামাডোল! যারা কল্পিত দুর্নীতির কেচ্ছা-কাহিনী নিয়ে দেশে-বিদেশে সক্রিয় ছিল দুর্বৃত্তায়িত সেই চক্রটিই এখন পদ্মা সেতুর শুভ উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে শুরু করেছে সেতুর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাক্কলিত বাজেটের অতিরিক্ত খরচের কথা বলে সাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা ।

আমাদের দেশে দুধরনের মানুষ আছে- এক ধরনের মানুষ কাজ করেন আর অন্য ধরনের মানুষ কেবল নিন্দাই করে বেড়ান। কোনো সাফল্য তারা কীভাবে সহ্য করবেন? পদ্মা সেতুর সাফল্য দক্ষিণ এশিয়াসহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে যখন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায় বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে তখন তার প্রভাব যে রাজনীতিতেও পড়বে তা বিএনপি-জামায়াত এবং তার সমমনা দলগুলো যথাসম্ভব উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছে । তাই সেতু উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে রেখে নতুন কৌশলে তারা অপপ্রচারে নেমেছেন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১০ লাখ কিংবা তার চেয়েও বেশি মানুষ সমবেত হবেন আশা করা যাচ্ছে । সেতুর এই উদ্বোধনকে সামনে রেখে বিএনপি পুনরায় ইতিহাস বিকৃতির পথেও হাঁটতে শুরু করেছে। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলেন বলেও সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম দাবি করেছেন! যা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রঙ্গরসে টইটম্বুর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এ ধরনের অপপ্রচার থেকে আতঙ্ক, আতঙ্ক থেকে বর্তমানে নাশকতার সন্দেহও সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে । ২০০১ সালের ৪ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২১ বছর পর আসছে ২৫ জুন ২০২২ সেই সেতুর উদ্বোধন করবেন। এই ২১টি বছর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার লালিত স্বপ্ন ও প্রত্যাশা কতভাবে কতবার যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তার অবধি নির্ণয় কঠিন। কত ষড়যন্ত্র, কত প্রতিবন্ধকতা, রাজনীতি তো বটেই- পারিবারিকভাবেও কত অপমান, কত লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে আমরা তার কীই বা জানি! কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়নের অমিত সাহসী জননেত্রী দেশি-বিদেশি নানামুখী চাপের মুখেও বাঙালির স্বাতন্ত্র্য, নিজ-পরিবার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আত্মমর্যাদার কথা ভুলে যাননি। বঙ্গবন্ধুও সব সময় নিজের এবং জাতির আত্মমর্যাদার বিষয়ে ছিলেন আপসহীন।

বিশ্ব দরবারে বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবনকেও বিপন্ন করেছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনাও জাতির পিতার যোগ্য সন্তানের পরিচয়কেই বিশ্ববাসীর সম্মুখে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শুধু পদ্মা সেতুর কথা কেন? যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ে যখন একেকজন অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় হচ্ছিল তখন বিভিন্ন রাষ্ট্র, বিভিন্ন রাষ্ট্রের নানা ধরনের সংগঠন এমনকি কোনো কোনো দেশের গণমাধ্যমও শেখ হাসিনার ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তখনো তিনি জাতির পিতার বাঙালিত্বের অহংবোধ ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। তার ধমনীতে বহমান রক্তস্রোত বঙ্গবন্ধুর মতোই স্ফূরিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদাবোধের তেজ শেখ হাসিনার মধ্যে থাকায় তিনিও আন্তর্জাতিক চাপগুলো রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দূরদর্শী প্রজ্ঞার কারণেই যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে কুখ্যাত রাজাকারদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সব বাধাবিপত্তি অপসৃত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাঙালির জন্য যে অনিবার্য ছিল তাও প্রমাণ করেছেন তিনি।

এক্ষণে আমরা শুরুর প্রশ্নগুলো এভাবে বিবেচনায় নিতে পারি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্পনার ‘আমার সোনার বাংলা’ কবিতার মতো শান্ত, সৌম্য, স্নিগ্ধ এবং ফুল ও ফসলে সমৃদ্ধ বাস্তবিক এক ভৌগোলিক বাংলা বিনির্মাণের প্রত্যয় বুকে ধারণ করে রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারই দিকনির্দেশনায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশকে সোনার বাংলা করাই ছিল তার লক্ষ্য। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ও নরপিশাচদের ক্ষমতার লোভের বলি হতে হয় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুর সব স্মৃতিচিহ্ন, সব রক্তধারা এদেশের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নিয়েছিল ঘাতকরা। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান না করলে তাদের পরিণতিও হতো পরিবারের হতভাগ্য ১৮ জন সদস্যের মতোই। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করার, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেয়ার ব্রত গ্রহণ করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। ‘সোনার বাংলা’ কাব্য-কথার মতো শোনায় বটে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ওই জেদটাই ছিল- বিমূর্তকে মূর্তায়নের। অর্থাৎ বাংলাদেশকে বাস্তবের সোনার বাংলা করার। শেখ হাসিনাও সেই জেদ, সেই তেজস্বী শক্তি নিয়ে রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হন। বঙ্গবন্ধুর মতো তারও বড় বড় স্বপ্ন দেখা শুরু। স্বপ্ন দেখে ভুলে যাওয়া নয়- স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলার নাম রাজনীতি- জাতির পিতার এই শিক্ষাই শেখ হাসিনার আদর্শ। তাই ১৯৭৫ সালের পর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন।

বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করতে হলে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে হবে এই সত্য উপলব্ধি থেকেই অন্যান্য সেতুর মতো পদ্মা সেতুরও স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। একটি মাত্র সেতুর অভাবে দেশের ২১টি জেলার মানুষের যোগাযোগ স্থবির ও মন্থর হয়ে থাকবে দিনের পর দিন তা হতে পারে না। এই স্থবির ও মন্থরতাই সোনার বাংলা গড়ার অন্তরায় ছিল। তাই আগে প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যমী স্বপ্ন দেখলেন তিনি। এই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ছোট একটি স্বপ্নের সাফল্য বড় আরেকটি স্বপ্নের জন্ম দেয়। পদ্মা সেতু আমাদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে- এই সাহস বৃদ্ধির পেছনের স্বপ্নবাজ মানুষটি জননেত্রী শেখ হাসিনা। সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সোনার বাংলার পানে আমরা আরো একধাপ এগিয়ে যাব। সেই স্পন্দিতচিত্তের সাহসে আমরা আজ উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত। সাফল্যের দিক থেকে পদ্মা সেতু যেমন অনন্য তেমনি এটি নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে তা পৃথিবীতে আর কোনো সেতু কেন কোনো স্থাপনা নিয়েই হয়নি। শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় সব ষড়যন্ত্র আজ যেন পদ্মারই প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে- বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু এখন সেতুর উদ্বোধন নিয়েও এক শ্রেণির দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি শুরু হয়েছে। সেতুর উদ্বোধনকে তারা বিয়ের অনুষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের বক্তব্যের ধরন দেখলেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যায়। সেতুর উদ্বোধন নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনার দায় সেসব দুর্বৃত্তেরই নিতে হবে। সাধারণেরও এ বিষয়ে সচেতনতা জরুরি ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন রাষ্ট্রনায়ক তখন তার মতো আমরাও বড় বড় স্বপ্ন দেখার প্রত্যয় অর্জন করি। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন আমাদের আরো বড় বড় স্বপ্নের অভিযাত্রী করে তোলে। বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও গ্রামীণ উন্নয়নশীল এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জীবনমানের উন্নয়ন ও জ্ঞান-মনোভাবের ব্যাপক পরিবর্তনে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির বিকল্প নেই। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার মাধ্যমে এর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার। দক্ষিণবঙ্গে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক বেড়ে যাবে। ফলে, বাংলাদেশ এর অভ্যন্তরে বাণিজ্য ঘাটতি যেমন কমবে ঠিক তেমনি শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে । শেখ হাসিনাই আমাদের ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। দুর্বৃত্তদের সব ষড়যন্ত্র এড়িয়ে সেই বড় বড় স্বপ্ন পূরণেও আমরা সক্ষম হব। এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে যারা পেছন থেকে টেনে ধরে তারা আঁস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হবে- এটাই ইতিহাসের নির্মমতা ।


আরো পড়ুন